প্রান্তোষ পালের কলমে

আজ এবাড়ি তো কাল ওবাড়ির উঠনে, আজ এপাড়ায় তো অন্যদিন ওপাড়ায় লেগেই থাকতো অনুষ্ঠান। অর্থাৎ রবীন্দ্রজয়ন্তী। দিনে দিনে এই উদ্দীপনা যেন ক্রমশ অস্তমিত। যেন সূর্য ডোবে ডোবে। এখন মনে হয় সেই সময়কার মানুষজন ছিল উন্মাদ। এই উন্মদনার লোকের সংখ্যা লঘু হওয়ার জন্যই কি এখন আর চোখে পরে না ? আগের মতো মাতামাতি নেই.........। যাক সেকথা এবার কবিদের কথাই বলবো। বঙ্গদেশে অনেক কবিই আছেন, কিন্তু আমি দুজন কবির কথাই বলি রবিন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল। ওঁদের দুজনের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য পাই দুজনাই ছিলেন কবি (একজন বিশ্বকবি অপরজন বিদ্রোহী) দুজনারই জন্ম ইংরাজির মেমাসে একজন প্রবীন অন্যজন নবীন কিন্তু দুজনার তিরোধান একই দশকে (একজনার আয়ুষ্কাল ৮০ অন্যজন ৭৭) বয়সের ব্যাবধান বিস্তর হলেও দুজনেই দুজনার প্রতিভার অনুরাগী ও শ্রদ্ধাশীল। এই শ্রদ্ধাশীলের একটি কথা উল্লেখ করছি।

চোখে দেখার আগেই যার বাঁশি শুনে মুগ্ধতা আসে তেমনটা কবি নজরুল সম্পর্কে কবিগুরুর মনে হয়েছিলো। নজরুলকে দেখার আগেই বীর-সৈনিকের রচনা পড়ে ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ এই নবীনের প্রতি গভীর ভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন যেমন, তেমনই, বিশ্বকবিকে না দেখেই কবিগুরুর প্রায় সব গানই নজরুলের মুখস্ত ছিল। নজরুলের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে, কবির বয়স তখন ২০। কবিগুরু কবিতাটি পড়ে নজরুলকে কবিসম্বোধন করে তার বসন্তনাটিকা উৎসর্গ করেন ১৯২৩ সালে। অথচ, তখন তার একটি মাত্র গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে নাম অগ্নিবীণা
এবারে দেখি এই দুই কবির প্রথম সন্ধিক্ষণ। বিশ্বকবির ৬০ বছর পুর্তি উৎসবে কবি-সম্বর্ধনা। উদ্দ্যোক্তা
-বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ। সভায় উপস্থিত ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতিন্দ্র মোহন বাগ্‌চী প্রমুখ বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক। অনুষ্ঠান শুরু হবে। সভায় উপবিষ্ট কবিগুরু। নজরুল সভাকক্ষে প্রবেশ করেই সোজা মঞ্চে উঠে কবিগুরুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। মাথায় ঠাকুরের আশীর্বাদ নিয়ে মঞ্চ ছাড়ার মুখেই খপ্‌ করে তার হাত ধরে টানলেন। নজরুল ফিরে তাকাতেই বললেন – ‘না, নজরুল, তুমি নিচে নয়, তুমি আমার পাশের আসনে বসো,’ তখন কবিগুরু ৬০, নজরুল ২২। এই ঘটনার জন্য কবিগুরু হয়তো সমালোচনায় পরেছিলেন, কারন তখন নজরুলকে অনেকেই চেনেন না, কিন্তু কবিগুরু তার দুয়েকটি লেখা পড়েই বুঝতে পেড়েছিলেন, যে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভবিষ্যৎ তাঁরই পার্শ্বে। এই ছিল কবীর দূরদৃষ্টির পরিচয়। হ্যাঁ, যে যাই বলুক আসুন, আমরা আগামী দিনেও বেশী বেশী করে পুরনো দিন গুলিতে ফিরে যেতে পারার চেষ্টা করে যাই, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যেন কবিদের কথা বলতে পারি। ধন্যবাদ।